নবম–দশম শ্রেণির রসায়ন বইয়ের ১২টি অধ্যায়ের প্রতিটির জন্য অন্তত একটি করে অ্যানিমেশন আছে, সাজানো অধ্যায়ের ক্রমে। প্রতিটি টপিকের নিচে বইয়ের অধ্যায়ের লিংক দেওয়া আছে।
নবম–দশম শ্রেণির রসায়ন বইয়ের ১২টি অধ্যায়ের প্রতিটির জন্য অন্তত একটি করে অ্যানিমেশন আছে, সাজানো অধ্যায়ের ক্রমে। প্রতিটি টপিকের নিচে বইয়ের অধ্যায়ের লিংক দেওয়া আছে।
রসায়ন হলো পদার্থের গঠন, ধর্ম আর তার পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞান। ভাত রান্না, লোহায় মরিচা ধরা, সাবান দিয়ে কাপড় পরিষ্কার: সবই রসায়ন। এর প্রধান শাখা জৈব, অজৈব, ভৌত, বিশ্লেষণী রসায়ন আর প্রাণরসায়ন।
বিজ্ঞানীরা নতুন জ্ঞান পান একটা নির্দিষ্ট পথে: কিছু দেখে প্রশ্ন জাগে, সম্ভাব্য উত্তর (অনুমান) ঠিক করা হয়, পরীক্ষা করে মেলানো হয়, তারপর সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত থেকে আবার নতুন প্রশ্ন আসে।
পর্যবেক্ষণ → প্রশ্ন → অনুমান → পরীক্ষা → সিদ্ধান্ত, তারপর আবার নতুন প্রশ্ন।
একটা উদাহরণ
বর্ষায় বারান্দার লোহার গ্রিলে মরিচা বেশি পড়ে (পর্যবেক্ষণ)। কেন (প্রশ্ন)? হয়তো পানি আর বাতাস দুটোই লাগে (অনুমান)। তিনটি পেরেক নাও: একটা শুকনো বাতাসে, একটা ফোটানো পানিতে তেলের স্তরের নিচে (বাতাস ছাড়া), আর একটা সাধারণ ভেজা অবস্থায়। কয়েক দিন পর শুধু শেষেরটায় মরিচা পড়বে (পরীক্ষা)। তাই মরিচার জন্য পানি আর অক্সিজেন দুটোই লাগে (সিদ্ধান্ত)।
ল্যাবরেটরিতে নিরাপত্তা
রাসায়নিকের বোতলে বিপদ বোঝাতে সতর্কতা প্রতীক থাকে, যেমন দাহ্য (আগুনের শিখা), বিষাক্ত (মাথার খুলি), ক্ষয়কারী (হাতে ও ধাতুতে তরল পড়ে ক্ষয়), বিস্ফোরক। ল্যাবে চোখের সুরক্ষা চশমা আর অ্যাপ্রন পরতে হয়, কোনো রাসায়নিক চেখে বা সরাসরি শুঁকে দেখা যায় না, আর এসিড পাতলা করতে সবসময় পানিতে এসিড ঢালতে হয়, এসিডে পানি নয়।
এক কথায়
রসায়ন পদার্থের গঠন, ধর্ম আর পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে, আর বিজ্ঞানের পদ্ধতি মানে পর্যবেক্ষণ থেকে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
তোমার চারপাশের সবকিছু এমন ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি যা চোখে দেখা যায় না। বরফ, পানি আর বাষ্প ঠিক একই কণা দিয়ে তৈরি। বদলায় শুধু কণাগুলো একে অপরকে কত শক্ত করে ধরে রাখে আর কতটা নড়াচড়া করে।
কঠিন: জায়গায় কাঁপে। তরল: কাছাকাছি, কিন্তু সরে যায়। গ্যাস: দূরে দূরে, দ্রুত ওড়ে।
কঠিন (বরফ): কণাগুলো সারিতে আটকানো। তারা কাঁপে, কিন্তু জায়গা ছাড়ে না, তাই কঠিন পদার্থের নিজস্ব আকার থাকে।
তরল (পানি): কণাগুলো কাছাকাছি, কিন্তু একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যেতে পারে। তরল গড়িয়ে চলে আর পাত্রের আকার নেয়, তবে আয়তন একই থাকে।
গ্যাস (বাষ্প): কণাগুলো অনেক দূরে দূরে, সব দিকে ছুটে বেড়ায়। গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে যেকোনো পাত্র ভরে ফেলে।
তাপে নাচ বদলায়
তাপ দিলে কণাগুলো বেশি শক্তি পায়, তাই বেশি নড়ে। বরফে তাপ দিলে ০ °সে তাপমাত্রায় সারিগুলো ভেঙে যায়: বরফ গলে। আরও তাপ দিলে ১০০ °সে তাপমাত্রায় (সমুদ্রপৃষ্ঠে) কণাগুলো পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যায়: পানি ফোটে। ঠান্ডা করলে উল্টোটা ঘটে: ঠান্ডা গ্লাসের গায়ে বাষ্প জমে পানি হয় (ঘনীভবন), আর ফ্রিজারে পানি জমে বরফ হয়।
নিজে করে দেখো
ঘরের এক কোণে আতরের শিশি খোলো। একটু পরেই ঘরের অন্য প্রান্তের কেউ গন্ধ পাবে। গ্যাসের কণাগুলো নিজে নিজেই বাতাসের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে গেছে। এভাবে ছড়িয়ে পড়াকে বলে ব্যাপন।
এক কথায়
কঠিন, তরল আর গ্যাসে কণা একই; পার্থক্য শুধু তারা কত শক্ত করে বাঁধা আর কত মুক্তভাবে চলে।
যেকোনো কণাকে খুব কাছ থেকে দেখলে পাওয়া যায় পরমাণু। পরমাণুর মাঝখানে থাকে ছোট্ট কিন্তু ভারী একটা কেন্দ্র, নাম নিউক্লিয়াস। এটি প্রোটন (ধনাত্মক চার্জ) আর নিউট্রন (চার্জহীন) দিয়ে তৈরি। তার চারপাশে ঘোরে অনেক হালকা ইলেকট্রন (ঋণাত্মক চার্জ)।
কার্বনে আছে ৬টি প্রোটন, ৬টি নিউট্রন আর ৬টি ইলেকট্রন: প্রথম শক্তিস্তরে ২টি, দ্বিতীয়তে ৪টি।
প্রোটনই ঠিক করে মৌল কোনটি
প্রোটনের সংখ্যাকে বলে পারমাণবিক সংখ্যা, আর এটাই ঠিক করে পরমাণুটি কোন মৌলের। যে পরমাণুতে ৬টি প্রোটন, সেটি কার্বন; যেটিতে ৮টি, সেটি অক্সিজেন। নিরপেক্ষ পরমাণুতে ইলেকট্রনের সংখ্যা প্রোটনের সংখ্যার সমান, তাই চার্জ কাটাকাটি হয়ে যায়।
শক্তিস্তর ভরে ভেতর থেকে
ইলেকট্রন আগে নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে কাছের শক্তিস্তর ভরে। প্রথম স্তরে সর্বোচ্চ ২টি, দ্বিতীয়তে সর্বোচ্চ ৮টি ইলেকট্রন থাকে। n-তম স্তরের নিয়ম ২n², তাই তৃতীয় স্তরে ১৮টি পর্যন্ত থাকতে পারে। সোডিয়ামের ১১টি ইলেকট্রনের বিন্যাস ২, ৮, ১। বাইরের ওই একা ইলেকট্রনটির কারণেই সোডিয়াম এত সহজে বিক্রিয়া করে।
প্রায় পুরোটাই ফাঁকা
নিউক্লিয়াস যদি একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের মাঝখানে রাখা মার্বেল হতো, তবে ইলেকট্রনগুলো ঘুরত গ্যালারির বাইরের সারিতে। পরমাণুর প্রায় পুরোটাই ফাঁকা জায়গা, অথচ প্রায় সব ভর ওই মার্বেলে। (আসলে ইলেকট্রন ছোট্ট গ্রহের চেয়ে মেঘের মতো আচরণ করে; শক্তিস্তরের ছবিটা স্কুলে ব্যবহৃত সহজ মডেল।)
এক কথায়
পরমাণু হলো প্রোটন-নিউট্রনের ছোট্ট নিউক্লিয়াস আর চারপাশের শক্তিস্তরে ইলেকট্রন; প্রোটনের সংখ্যাই ঠিক করে মৌল কোনটি।
১৮৬৯ সালে দিমিত্রি মেন্ডেলিফ তখনকার জানা মৌলগুলোকে পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজিয়ে দেখালেন, একই রকম ধর্মের মৌল নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসে। আধুনিক পর্যায় সারণিতে মৌল সাজানো হয় পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটনের সংখ্যা) অনুসারে। এখন পর্যন্ত জানা মৌল ১১৮টি।
পর্যায় (আড়াআড়ি সারি, মোট ৭টি): একই পর্যায়ের মৌলের শক্তিস্তরের সংখ্যা সমান।
গ্রুপ (খাড়া কলাম, মোট ১৮টি): একই গ্রুপের মৌলের বাইরের স্তরে ইলেকট্রন সংখ্যা সমান, তাই এদের রাসায়নিক ধর্মও কাছাকাছি।
প্রথম ১৮টি মৌল (মাঝের গ্রুপ ৩–১২ বাদ দিয়ে দেখানো)। একই কলামের মৌলগুলো যেন এক পরিবারের সদস্য।
কয়েকটি পরিবার
গ্রুপ ১, ক্ষার ধাতু (লিথিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম): বাইরের একটি ইলেকট্রন সহজে ছেড়ে দেয়, তাই পানির সঙ্গে জোরালো বিক্রিয়া করে। এদের কেরোসিনে ডুবিয়ে রাখা হয়।
গ্রুপ ১৭, হ্যালোজেন (ফ্লোরিন, ক্লোরিন): একটি ইলেকট্রন নিয়ে বাইরের স্তর পূর্ণ করতে চায়, খুব সক্রিয়।
গ্রুপ ১৮, নিষ্ক্রিয় গ্যাস (হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন): বাইরের স্তর পূর্ণ, তাই প্রায় বিক্রিয়াই করে না। বৈদ্যুতিক বাল্বে আর্গন ভরা হয়।
সারণির বাঁ দিকে ধাতু, ডান দিকে অধাতু, আর মাঝের সীমানায় অর্ধধাতু (যেমন সিলিকন, যা দিয়ে কম্পিউটারের চিপ তৈরি)।
এক কথায়
পর্যায় সারণিতে মৌল পারমাণবিক সংখ্যা অনুসারে সাজানো; একই গ্রুপের মৌলের বাইরের ইলেকট্রন সমান, তাই ধর্মও কাছাকাছি।
পরমাণুরা সবচেয়ে স্থিতিশীল থাকে যখন তাদের বাইরের শক্তিস্তর পূর্ণ থাকে (সাধারণত ৮টি ইলেকট্রন, একে বলে অষ্টক)। নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো পূর্ণ স্তর পেতে পরমাণুরা ইলেকট্রন দেয়, নেয় বা ভাগাভাগি করে। এভাবেই তৈরি হয় রাসায়নিক বন্ধন।
সোডিয়াম তার বাইরের ১টি ইলেকট্রন ক্লোরিনকে দিয়ে দেয়। দুজনেরই বাইরের স্তর পূর্ণ হয়, আর বিপরীত চার্জের আয়ন দুটি একে অপরকে আঁকড়ে ধরে: তৈরি হয় খাবার লবণ NaCl।
তিন রকম বন্ধন
আয়নিক বন্ধন: ধাতু ইলেকট্রন দেয়, অধাতু নেয় (NaCl)। আয়নিক যৌগের গলনাঙ্ক বেশি; পানিতে গলালে বা গলিত অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
সমযোজী বন্ধন: দুটি অধাতু ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে। হাইড্রোজেন অণুতে (H₂) দুটি H একজোড়া ইলেকট্রন ভাগ করে; পানিতে (H₂O) অক্সিজেন দুটি H-এর সঙ্গে একজোড়া করে ভাগ করে; মিথেনে (CH₄) কার্বন চারটি H-এর সঙ্গে।
ধাতব বন্ধন: ধাতুর পরমাণুগুলো বাইরের ইলেকট্রন একটা সাধারণ "ইলেকট্রনের সাগরে" ছেড়ে দেয়। এই মুক্ত ইলেকট্রনের জন্যই ধাতু বিদ্যুৎ আর তাপ পরিবহন করে।
এক কথায়
বাইরের স্তর পূর্ণ করতে পরমাণু ইলেকট্রন দেয়-নেয় (আয়নিক), ভাগাভাগি করে (সমযোজী) বা সবার মাঝে ছেড়ে দেয় (ধাতব)।
ডিম গোনা হয় ডজনে (১২টি)। পরমাণু এত ছোট যে রসায়নবিদেরা গোনেন মোলে: ১ মোল মানে ৬.০২২ × ১০²³টি কণা (পরমাণু, অণু বা আয়ন)। এই বিশাল সংখ্যার নাম অ্যাভোগাড্রো সংখ্যা।
কোনো পদার্থের ১ মোলের ভরকে গ্রামে প্রকাশ করলে তা তার আণবিক (বা পারমাণবিক) ভরের সমান: এটাই মোলার ভর। কার্বনের ১২ g, পানির (২ + ১৬ =) ১৮ g, লবণের (২৩ + ৩৫.৫ =) ৫৮.৫ g।
তিনটি পাত্রের ভর আলাদা, কিন্তু প্রতিটিতে কণার সংখ্যা সমান: ১ মোল।
মোল সংখ্যা = ভর ÷ মোলার ভর
সমীকরণে মোলের হিসাব
2H₂ + O₂ → 2H₂O মানে ২ মোল হাইড্রোজেন ১ মোল অক্সিজেনের সঙ্গে মিলে ২ মোল পানি দেয়। ভরে: ৪ g H₂ + ৩২ g O₂ = ৩৬ g পানি। বিক্রিয়ার আগে-পরে মোট ভর একই থাকে।
প্রমাণ তাপমাত্রা ও চাপে (STP) যেকোনো গ্যাসের ১ মোলের আয়তন প্রায় ২২.৪ লিটার।
এক কথায়
১ মোল = ৬.০২২ × ১০²³টি কণা; মোল সংখ্যা = ভর ÷ মোলার ভর, আর সমীকরণের সহগগুলো মোলের অনুপাত বলে দেয়।
রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পুরোনো বন্ধন ভাঙে, নতুন বন্ধন তৈরি হয়, আর জন্ম নেয় নতুন পদার্থ। পরমাণু কিন্তু হারায় না, নতুনও আসে না; শুধু নতুনভাবে জোড়া লাগে। তাই বিক্রিয়ার আগে-পরে মোট ভর সমান (ভরের নিত্যতা সূত্র)।
বাঁয়ে দুটি H₂ আর একটি O₂, ডানে দুটি H₂O। চারটি H আর দুটি O, আগে-পরে একই পরমাণু।
বিক্রিয়া হচ্ছে বোঝার চিহ্ন: গ্যাস বা বুদ্বুদ বের হওয়া, রং বদলানো, তাপ বা আলো তৈরি হওয়া, অথবা দ্রবণে অদ্রবণীয় কঠিন (অধঃক্ষেপ) পড়া।
কয়েক রকম বিক্রিয়া
সংযোজন: দুই বা তার বেশি পদার্থ মিলে একটি: C + O₂ → CO₂।
বিয়োজন: একটি পদার্থ ভেঙে একাধিক: চুনাপাথর গরম করলে CaCO₃ → CaO + CO₂।
প্রতিস্থাপন: বেশি সক্রিয় মৌল কম সক্রিয়টিকে সরিয়ে দেয়: Zn + CuSO₄ → ZnSO₄ + Cu।
জারণ-বিজারণ: ইলেকট্রন আদান-প্রদান; লোহায় মরিচা পড়া এক ধরনের জারণ।
বিক্রিয়া দ্রুত হয় কিসে
তাপমাত্রা বাড়ালে, দ্রবণ ঘন করলে, কঠিন পদার্থ গুঁড়া করে উপরিতলের ক্ষেত্রফল বাড়ালে, আর প্রভাবক দিলে বিক্রিয়ার হার বাড়ে। প্রভাবক নিজে শেষে অপরিবর্তিত থাকে। এ জন্যই ফ্রিজে খাবার ধীরে নষ্ট হয়: ঠান্ডায় বিক্রিয়া ধীর।
এক কথায়
বিক্রিয়ায় বন্ধন ভেঙে নতুন বন্ধন গড়ে, পরমাণু আর মোট ভর একই থাকে, আর তাপ, ঘনমাত্রা, উপরিতল ও প্রভাবক বিক্রিয়ার হার বাড়ায়।
বন্ধন ভাঙতে শক্তি লাগে, বন্ধন গড়লে শক্তি বের হয়। কোনো বিক্রিয়ায় নতুন বন্ধন গড়ে বেশি শক্তি বেরোলে চারপাশ গরম হয়; কম বেরোলে বিক্রিয়া চারপাশ থেকে তাপ টেনে নেয়।
দুই ক্ষেত্রেই শুরুতে একটা "পাহাড়" পেরোতে হয়: একে বলে সক্রিয়ণ শক্তি। দেশলাই ঘষার তাপ সেই প্রথম ধাক্কা দেয়।
তাপোৎপাদী বিক্রিয়া: গ্যাসের চুলায় মিথেনের দহন, আমাদের কোষে শ্বসন, চুনে পানি দেওয়া (পানি গরম হয়ে ওঠে)।
তাপহারী বিক্রিয়া: সালোকসংশ্লেষণ (সূর্যের শক্তি শোষণ), পানিতে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড গোলালে পাত্র ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
রাসায়নিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ
ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ কোষে জারণ-বিজারণ বিক্রিয়ার রাসায়নিক শক্তি সরাসরি বিদ্যুতে বদলে যায়: টর্চের শুষ্ক কোষ, মোবাইলের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। উল্টোভাবে তড়িৎ বিশ্লেষণে বিদ্যুৎ দিয়ে যৌগ ভাঙা হয়: পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন, কিংবা গলিত লবণ থেকে সোডিয়াম। চামচে রুপা বা ক্রোমের প্রলেপও (তড়িৎ প্রলেপন) এভাবেই দেওয়া হয়।
এক কথায়
বন্ধন ভাঙতে শক্তি লাগে, গড়লে বের হয়; তাপোৎপাদী বিক্রিয়া চারপাশ গরম করে, তাপহারী বিক্রিয়া ঠান্ডা করে, আর বিদ্যুৎ কোষ রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুতে বদলায়।
লেবুর রস আর ভিনেগার টক: এরা এসিড (অম্ল)। সাবান আর খাবার সোডা পিচ্ছিল লাগে: এরা ক্ষারক (যে ক্ষারক পানিতে দ্রবীভূত হয় তাকে বলে ক্ষার)। কোনো দ্রবণ কতটা অম্লীয় বা ক্ষারীয়, তা মাপা হয় pH স্কেলে, ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত।
৭-এর নিচে অম্লীয়, ৭ নিরপেক্ষ, ৭-এর ওপরে ক্ষারীয়। ৭ থেকে যত দূরে, তত তীব্র।
প্রতি ধাপে দশ গুণ
pH স্কেলের প্রতিটি ধাপ দশ গুণের। pH ৩-এর দ্রবণ pH ৪-এর চেয়ে দশ গুণ বেশি অম্লীয়, আর pH ৫-এর চেয়ে একশো গুণ। খাবার হজমে সাহায্য করতে তোমার পাকস্থলী তীব্র এসিড তৈরি করে (pH খুব কম)।
প্রশমন
এসিড আর ক্ষারক মেশালে তারা একে অপরকে প্রশমিত করে, তৈরি হয় লবণ আর পানি। এভাবেই অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট (মৃদু ক্ষারক) পাকস্থলীর অ্যাসিডিটি কমায়।
নিজে করে দেখো
কয়েকটা লাল বাঁধাকপির পাতা পানিতে সেদ্ধ করে বেগুনি পানিটা ঠান্ডা করো। এটা একটা নির্দেশক: একটু ভিনেগার দিলে গোলাপি হয়ে যায়, সাবান-পানি দিলে নীল বা সবুজ। ল্যাবরেটরিতে লিটমাস কাগজ একই কাজ করে: এসিডে লাল, ক্ষারকে নীল হয়। (পরীক্ষার জন্য কখনো কোনো রাসায়নিক চেখে দেখবে না।)
এক কথায়
pH ০ থেকে ১৪: ৭-এর নিচে এসিড, ৭ নিরপেক্ষ, ৭-এর ওপরে ক্ষারক; আর এসিড-ক্ষারক মিলে একে অপরকে প্রশমিত করে।
ধাতু সাধারণত চকচকে, তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবহন করে, পিটিয়ে পাত (ঘাতসহ) আর টেনে তার (নমনীয়) করা যায়। ব্যতিক্রমও আছে: পারদ ঘরের তাপমাত্রায় তরল। অধাতু (কার্বন, সালফার, অক্সিজেন) সাধারণত ভঙ্গুর আর বিদ্যুৎ অপরিবাহী, তবে গ্রাফাইট (কার্বনের একটি রূপ) বিদ্যুৎ পরিবহন করে।
সক্রিয়তা সিরিজ: যত ওপরে, তত সহজে বিক্রিয়া করে। সোনা এত কম সক্রিয় যে হাজার বছর পরেও চকচকে থাকে।
সক্রিয়তা সিরিজ কাজে লাগে
প্রতিস্থাপন: ওপরের ধাতু নিচের ধাতুকে তার লবণ থেকে সরিয়ে দেয়। কপার সালফেটের নীল দ্রবণে লোহার পেরেক রাখলে পেরেকে লালচে কপারের স্তর পড়ে: Fe + CuSO₄ → FeSO₄ + Cu।
নিষ্কাশন: খুব সক্রিয় ধাতু আকরিক থেকে বের করতে তড়িৎ বিশ্লেষণ লাগে (বক্সাইট থেকে অ্যালুমিনিয়াম); মাঝারি সক্রিয় ধাতু কার্বন দিয়ে বিজারিত করা যায় (মারুত চুল্লিতে লোহা)।
মরিচা আর তা ঠেকানো
লোহায় মরিচা পড়তে পানি আর অক্সিজেন দুটোই লাগে। রং বা তেলের প্রলেপ, কিংবা দস্তার (জিংক) প্রলেপ দিয়ে মরিচা ঠেকানো হয়; দস্তার প্রলেপকে বলে গ্যালভানাইজিং। ঘরের চালের ঢেউটিন আসলে দস্তার প্রলেপ দেওয়া লোহার পাত।
এক কথায়
ধাতু চকচকে, পরিবাহী ও ঘাতসহ; সক্রিয়তা সিরিজের ওপরের ধাতু নিচেরটিকে সরিয়ে দেয়, আর দস্তার প্রলেপ লোহাকে মরিচা থেকে বাঁচায়।
কোটি কোটি বছর আগের উদ্ভিদ আর ক্ষুদ্র জীবের দেহাবশেষ মাটির নিচে প্রচণ্ড চাপ আর তাপে ধীরে ধীরে কয়লা, পেট্রোলিয়াম আর প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত হয়েছে। এগুলোই জীবাশ্ম জ্বালানি। একবার ফুরালে আবার তৈরি হতে লাখ লাখ বছর লাগে, তাই এগুলো অনবায়নযোগ্য।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন (CH₄); তিতাস দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় আছে কয়লাখনি।
আংশিক পাতন: যার স্ফুটনাঙ্ক যত কম, সে তত ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে আলাদা হয়।
হাইড্রোকার্বন
পেট্রোলিয়ামের উপাদানগুলো মূলত হাইড্রোকার্বন: শুধু কার্বন আর হাইড্রোজেনের যৌগ। অ্যালকেনের সাধারণ সংকেত CₙH₂ₙ₊₂ (মিথেন CH₄, ইথেন C₂H₆)। ইথিনের মতো ছোট অণু হাজারে হাজারে জোড়া লেগে তৈরি করে পলিমার, যেমন পলিথিন।
দহন আর সতর্কতা
পর্যাপ্ত অক্সিজেনে মিথেন পুড়ে হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড আর পানি: CH₄ + 2O₂ → CO₂ + 2H₂O। অক্সিজেন কম থাকলে তৈরি হয় বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড, যার রং বা গন্ধ নেই। তাই বন্ধ ঘরে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা বিপজ্জনক; জানালা খোলা রাখো। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে বাড়তি CO₂ বায়ুমণ্ডলে জমে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।
এক কথায়
জীবাশ্ম জ্বালানি প্রাচীন জীবের দেহাবশেষ থেকে তৈরি অনবায়নযোগ্য হাইড্রোকার্বন; আংশিক পাতনে পেট্রোলিয়াম আলাদা হয়, আর অসম্পূর্ণ দহনে তৈরি হয় বিষাক্ত CO।
শুধু পানিতে কাপড়ের তেলের দাগ ওঠে না, কারণ তেল আর পানি মেশে না। সাবানের অণুর দুই প্রান্ত দুই রকম: একটা পানি-প্রিয় মাথা, আর একটা লম্বা তেল-প্রিয় লেজ। লেজগুলো তেলের ভেতরে ঢুকে যায়, মাথাগুলো থাকে বাইরে পানির দিকে। ফলে তেলের ফোঁটা সাবানের অণুতে মোড়া একটা ছোট্ট বলের মতো পানিতে ভেসে ওঠে আর ধুয়ে চলে যায়।
লেজ তেলে, মাথা পানিতে: সাবানের অণু তেলের ফোঁটাকে ঘিরে কাপড় থেকে তুলে নেয়।
সাবান তৈরি হয় তেল বা চর্বিকে কস্টিক সোডা (NaOH) দিয়ে ফুটিয়ে (সাবানায়ন)। খর পানিতে (যাতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম লবণ বেশি) সাবান সহজে ফেনা তৈরি করে না, গাদ জমে; ডিটারজেন্ট খর পানিতেও কাজ করে।
পানি নিরাপদ করা
ফিটকিরি দিলে ঘোলা পানির ময়লা জমাট বেঁধে তলায় বসে যায়।
ফুটালে বা ক্লোরিন (ব্লিচিং পাউডার) দিলে জীবাণু মরে।
বাংলাদেশের অনেক এলাকার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক আছে; ফুটালেও আর্সেনিক যায় না। তাই নলকূপের পানি পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।
আরও রসায়ন চারপাশে: দেশের ইউরিয়া সারকারখানাগুলো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সার তৈরি করে, আর খাবার সংরক্ষণে লবণ, চিনি ও ভিনেগার জীবাণুর বৃদ্ধি ঠেকায়।
এক কথায়
সাবানের অণুর লেজ তেলে আর মাথা পানিতে থাকে, তাই তেলকে ঘিরে তুলে নেয়; ফিটকিরি, ফুটানো আর ক্লোরিন পানি নিরাপদ করে।